প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে মাঝারি মাত্রা (প্রায় ২০%) পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু একবার এই স্তরে পৌঁছে গেলে, এরপর উচ্চমাত্রা—বিশেষ করে ৯০% (যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য দরকার)—অর্জন করা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইউরেনিয়াম ৬০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা যায়, তাহলে সেখান থেকে ৯০%-এ পৌঁছানো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সম্ভব।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে যে নতুন পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তা ২০১৫ সালের চুক্তির চেয়েও উন্নত হবে। উল্লেখ্য, তিনি ২০১৮ সালে নিজেই যুক্তরাষ্ট্রকে সেই পুরনো চুক্তি থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদও বাড়িয়েছেন, যাতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শর্তগুলোর একটি হলো—ইরানকে সম্পূর্ণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক কাজে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই যথেষ্ট, কিন্তু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম।
ইউরেনিয়াম একটি ভারি ও প্রাকৃতিকভাবে তেজস্ক্রিয় ধাতু, যা পৃথিবীর মাটি, পাথর এবং এমনকি সমুদ্রের পানিতেও অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। বিশ্বের অধিকাংশ ইউরেনিয়াম উৎপাদন হয় কয়েকটি দেশে—কাজাখস্তান, কানাডা, নামিবিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং উজবেকিস্তান।

খনি থেকে ইউরেনিয়াম সংগ্রহের পর এটি কয়েকটি ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। প্রথমে আকরিক থেকে ‘ইয়েলোকেক’ নামে এক ধরনের পাউডার তৈরি করা হয়। এরপর তা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ‘সবুজ লবণ’ (ইউরেনিয়াম টেট্রাফ্লোরাইড) এবং পরে ‘ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড’ নামের সাদা স্ফটিকে রূপান্তরিত হয়, যা সহজে গ্যাসে পরিণত করা যায়। এই গ্যাসই সমৃদ্ধকরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। পরে তা থেকে ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড তৈরি করে ছোট ছোট পেলেটে রূপান্তর করা হয়, যা পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে প্রধানত তিনটি আইসোটোপ থাকে—ইউ-২৩৮ (প্রায় ৯৯.৩%), ইউ-২৩৫ (প্রায় ০.৭%) এবং ইউ-২৩৪ (অতি সামান্য)। এর মধ্যে ইউ-২৩৫-ই শক্তি উৎপাদন ও অস্ত্র তৈরিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে এই ইউ-২৩৫-এর পরিমাণ বাড়ানো হয়।
এই কাজটি করা হয় ‘সেন্ট্রিফিউজ’ নামের যন্ত্রের মাধ্যমে। এতে ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাসকে অত্যন্ত দ্রুত ঘোরানো হয়, ফলে ভারী ইউ-২৩৮ বাইরে সরে যায় এবং হালকা ইউ-২৩৫ ভেতরে জমা হয়। একাধিক সেন্ট্রিফিউজকে সারিবদ্ধভাবে (ক্যাসকেড আকারে) ব্যবহার করে ধাপে ধাপে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়।
সমৃদ্ধকরণের বিভিন্ন স্তর রয়েছে—৩–৫% (বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন), ৫–১৯.৯% (আধুনিক চুল্লি), ২০–৮৫% (গবেষণা), এবং ৯০% বা তার বেশি (অস্ত্র)। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০% এর নিচের ইউরেনিয়ামকে ‘লো-এনরিচড’ এবং তার ওপরে ‘হাইলি-এনরিচড’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে।
সমৃদ্ধকরণের জটিলতা মাপা হয় ‘সেপারেটিভ ওয়ার্ক ইউনিট’ (এসডব্লিউইউ) দিয়ে। তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০% সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা আরও সমৃদ্ধ করা হলে তাত্ত্বিকভাবে ১০–১১টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) অধ্যাপক টেড পস্তল জানান, ইরানের কাছে উন্নত আইআর-৬ সেন্ট্রিফিউজের বহু ক্যাসকেড রয়েছে, যা বছরে প্রায় ৯০০–১০০০ এসডব্লিউইউ উৎপাদন করতে পারে। তার হিসাব অনুযায়ী, প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম থেকে ৬০% পর্যন্ত যেতে কয়েক বছর সময় লাগলেও, ৬০% থেকে ৯০% যেতে মাত্র কয়েক সপ্তাহই যথেষ্ট।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনা খুব ছোট জায়গায় বসানো সম্ভব—প্রায় একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টের সমান জায়গায়। এমনকি তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও এগুলো চালানো যায়, ফলে গোপনে এই কার্যক্রম চালানো কঠিন নয়।
বিশ্বে বর্তমানে মোট নয়টি দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তাদের মধ্যে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই সবচেয়ে বেশি মজুত আছে। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা একমাত্র দেশ, যারা স্বেচ্ছায় তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যদিও তারা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার করেনি।


